ইলেমেট প্লাস ও লরেক্স প্লাস লোশনের দাম দ্বিগুণ: শেরপুর থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবাদ

ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনে দাম বৃদ্ধি, তবুও প্রশ্ন রয়ে গেছে, দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ?
চুলকানি ও ত্বকের রোগে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘ইলেমেট প্লাস’ ও অপসোনিন ফার্মার ‘লরেক্স প্লাস’ লোশনের দাম হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় শেরপুরের ওষুধ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের 'ইলেমেট প্লাস' লোশন এর দাম গত বছরের শেষের দিকে বাড়ানো হয়, আর অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের ‘লরেক্স প্লাস’ এর দাম চলতি মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে। উভয় কোম্পানিই ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই বাজারে নতুন দামে ওষুধ ছেড়েছে বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্টরা।
৬০ মিলিলিটারের ইলেমেট প্লাস ৯০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকা ও চলতি মাসে ৭০ মিলিলিটারের লরেক্স প্লাস লোশন ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এভাবে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যবৃদ্ধি নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও ভুক্তারা।
তবে এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এই অনুমোদনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? কে নির্ধারণ করে ওষুধের দাম? ভোক্তাদের স্বার্থ কি সেখানে বিবেচনায় নেওয়া হয়?
শেরপুর শহরের রঘুনাথ বাজারের মমতাজ মেডিকেলের মালিক গোলাম মোস্তফা বলেন, “ওষুধ কোম্পানিগুলো হঠাৎ করে মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ কেন্দ্রীয়ভাবে এ দামবৃদ্ধির কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এতে আমরাও বিপাকে পড়ছি।”
নারায়ণপুরের তাসিম ড্রাগ হাউজের মালিক এ এস এম সাঈম বলেন, “ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা হঠাৎ মেসেজ পাঠিয়ে দাম বৃদ্ধির কথা জানায়। পরদিন ইনভয়েসে বাড়তি দামে পণ্য দিয়ে যায়। কিন্তু দাম বৃদ্ধির কোনো অফিসিয়াল প্রমাণপত্র তারা দেয় না।”
সাধারণ ভোক্তাও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। নারায়ণপুরের গৃহিণী সুমনা বলেন, “আগে মাসে ৫ হাজার টাকার ওষুধ কিনতাম, এখন তা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের আয় বাড়েনি, কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।”
শেরপুর জেলা কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি মো. মমতাজ উদ্দিন বলেন, “একটি গোষ্ঠী অতিরিক্ত মুনাফার আশায় জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে অবিচার করছে। সরকারের উচিত এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।”
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, শেরপুরের সহকারী পরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “একই গুণগত মানের ওষুধ কিছু কোম্পানি এখনো আগের দামে বিক্রি করছে। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়িয়েছে, যার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে।”
ওষুধ প্রশাসনের শেরপুর কার্যালয়ের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক (ড্রাগ সুপার) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “জেলা পর্যায়ে ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা আমাদের নেই। কোম্পানিগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে দাম নির্ধারণ করে। তবে যদি কোনো অনিয়ম হয় বা অনুমোদনের বাইরে দাম বাড়িয়ে বিক্রি হয়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেই।”
এ বিষয়ে শেরপুর জেলার সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ শাহীন ওষুধের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে এ প্রতিনিধির কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সচেতন মহল বলছে, “যখন শেরপুরের মতো একটি জেলা থেকে সাধারণ জনগণ মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে মুখর হয়, তখন বুঝতে হবে বিষয়টি স্থানীয় নয়, বরং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।” তারা আরও বলেন, “ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন নিয়েও যদি এমন প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়।”
তাদের মতে, দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা, ভোক্তা স্বার্থের প্রতিফলন এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকলে ওষুধের বাজার হবে একচেটিয়া। যেখানে জনগণ শুধু ভুক্তভোগীই থাকবে।