গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ: গাজীপুরে সাংবাদিক হত্যার নির্মম বার্তা


মারুফুর রহমান: গাজীপুরে দৈনিক "প্রতিদিনের কাগজ" এর প্রতিনিধি সাংবাদিক আছাদুজ্জান তুহিন কর্তব্য পালনের সময় চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হয়েছেন। পেশাগত দায়বদ্ধতার মধ্যেই এইভাবে একজন সংবাদকর্মীর পথচলা থেমে যাওয়া আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
একজন সংবাদকর্মী শুধুই খবর লেখেন না- তিনি সমাজের আয়না। তথ্যের সত্যতা যাচাই করে, অনুসন্ধান করে, দায়িত্বের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করেন। তাঁর কাজ কেবল কাগজে লেখা ছাপা নয়, বরং মানুষের জানার অধিকারকে রক্ষা করা। এই দায়িত্বপালন করতে গিয়েই যদি একজনের পথ থেমে যায়, তা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
তথ্য প্রকাশে শঙ্কা কেন?
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংবাদকর্মীদের পেশাগত ঝুঁকি বেড়েছে- এটা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই চাপ, হুমকি কিংবা বাধার মুখে পড়ছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করা সাংবাদিকরা অনেক সময় দলীয় রাজনীতি, প্রশাসনিক প্রভাব ও অপরাধচক্রের মুখোমুখি হন। তখন তাঁদের একমাত্র ভরসা থাকে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ও সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ।
গাজীপুরের সংবাদকর্মী তুহিন এর সঙ্গে যা ঘটেছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কেউ নিরাপদ না থাকলে সত্য কথনও নিরাপদ নয়।
দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ জরুরি:
আমরা চাইবো সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করুক এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করুক। একজন সংবাদকর্মীর অকাল থেমে যাওয়া শুধু তাঁর পরিবারের ক্ষতি নয়- সমাজ ও রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি। এ ঘটনার মাধ্যমে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো সংবাদকর্মী নিরুৎসাহিত বা অনিরাপদ বোধ না করেন, সে দিকেও নজর দিতে হবে।
গণমাধ্যম নিরাপদ থাকলে রাষ্ট্রও নিরাপদ:
গণমাধ্যম কোনো বিরোধী শক্তি নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যকর বিকাশে অন্যতম স্তম্ভ। যখন সংবাদপত্র অবাধে কাজ করতে পারে, তখন রাষ্ট্রের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও জবাবদিহির আওতায় থাকে। তাই সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি পেশাকে রক্ষা করা নয়, বরং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।
আমাদের করণীয়:
১. স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করা সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ
২. সংবাদকর্মীদের জন্য একটি জাতীয় হেল্পলাইন ও পর্যবেক্ষণ সেল প্রতিষ্ঠা
৩. প্রতিটি অভিযোগ বা শঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া
৪. সাংবাদিকবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা
এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো প্রতিবারই আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে- গণমাধ্যমের কর্মীরা সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে কতটা সুরক্ষিত? রাষ্ট্র কি তাদের পাশে রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা সবাই মিলে খুঁজে বের করব।